দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা - সূর্য উদয়


দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা

0

দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকাঃ

যাকাতের অন্যতম অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামী সমাজ হতে দরিদ্রতা দূর করা। দারিদ্র্যতা মানবতার পয়লা নম্বরের দুশমন। ক্ষেত্র বিশেষে তা কুফরী পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। যে কোন সমাজ ও দেশের এটা সবচেয়ে জটিল ও তীব্র সমস্যা। সমাজে হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতি সৃষ্টি হয় দারিদ্র্যতার ফলে। পরিনামে দেখা দেয় সামাজিক সংঘাত। বহু সময়ে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান পর্যন্ত ঘটে। অধিকাংশ অপরাধই সচরাচর ঘটে দরিদ্রতার জন্য। এ সমস্যাগুলির প্রতিবিধান করার জন্যে যাকাত ইসলামের অন্যতম মুখ্য হাতিয়ার। যে আট শ্র্রেণীর লোকের কথা পূর্বেই উলেখ করা হয়েছে, যাকাত লাভের ফলে তাদের দিনগুলি আনন্দ ও নিরাপত্তার হতে পারে। যাকাত যথাযথভাবে আদায় ও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হলে আজকের দিনেও এর মাধ্যমে দরিদ্রতা দূর করা সম্ভব।

কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয়, এক সময়ে যে যাকাত পদ্ধতি চালু ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারনে জাযিরাতুল আরবে যাকাত গ্রাহকের সন্ধান পাওয়া ছিল দূর্লভ, আজও সেই যাকাত ব্যবস্থা চালু থাকা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বে দুঃস্থ, অভাবী ও নিস্ব লোকের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মূল কারণ হলো- মুসলিম দেশগুলিতে আজ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত আদায় ও বিলি-বন্টনের ব্যবস্তা নেই। উপরন্তু বহু বিত্তশালী মুসলিমই যাকাত আদায় করেন না। যারা যাকাতের অর্থ প্রদান করেন তাদেরও বেশির ভাগই বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিতভাবে যাকাতের অর্থ বিলি-বন্টন করেন। তাতে না সমাজের তেমন উপকার হয়, না অভাবী ও দরিদ্র জনগনের সমস্যার স্থায়ী সুরাহা হয়। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারবো যে, আসলে আমরা যে সমাজে বাস করি, তার কল্যাণ ও উন্নতির সাথেই আমাদের কল্যাণ ও উন্নতি জড়িত। আমি যদি আমার অর্থ সম্পদ থেকে আমার ভাইদের সাহায্য করি, তবে তা আবর্তিত হয়ে বহু কল্যাণ সাথে নিয়ে আমার কাছেই ফিরে আসবে। কিন্তু আমি যদি সংকীর্ণ দৃষ্টির বশবর্তী হয়ে তা নিজের কাছেই জমা করে রাখি কিংবা কেবল নিজের ব্যক্তি স্বার্থেই ব্যয় করি, তবে শেষ পর্যন্ত তা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে বাধ্য।

যেমন ধরুন, কেউ যদি একজন এতিম শিশুকে প্রতিপালন করেন এবং তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে সমাজের একজন উপার্জনক্ষম সদস্যে পরিনত করে দেন, তবে আসলে তিনি সমাজের সম্পদই বৃদ্ধি করলেন। আর সমাজের সম্পদ যখন বৃদ্ধি পাবে, তখন সমাজের একজন সদস্য হিসেবে তিনিও তার অংশ লাভ করবেন। তবে এই অংশ যে তিনি সেই বিশেষ এতিমটির যোগ্যতার ফলে লাভ করেছেন, যাকে তিনি সাহায্য করেছিলেন, তা হয়তো ঐ ব্যক্তি হিসাব করে মিলাতে পারবেন না। কিন্তু তিনি যদি সংকীর্ণ দৃষ্টির বশবর্তী হয়ে বলেন যে, আমি তাকে সাহায্য করবো কেন? তার বাপের উচিত ছিলো তার জন্য কিছু রেখে যাওয়া। তবেতো সে ভবোঘুরের মতো টো টো করে ঘুরে বেড়াবে। বেকার অকর্মণ্য হয়ে পড়বে। নিজের শ্রম খাটিয়ে সমাজের সম্পদ বৃদ্ধি করার যোগ্যতাই তার মধ্যে সৃষ্টি হবে না। বরং সে ব্যক্তি যদি অপরাধ প্রবণ হয়ে কারো ঘরে সিঁদ কাটে অথবা যে সাহায্য করলো না তার ঘরেই সিঁদ কাটে তাহলে তাতেও বিষ্ময়ের কিছু থাকবে না। এর অর্থ এই দাড়াবে যে, তিনি সমাজের একজন অকর্মণ্য, ভবঘুরে এবং অপরাধ প্রবণ বানিয়ে কেবল তারই ক্ষতি করেন নি, নিজেরও ক্ষতি করলেন।

বেশিরভাগ লোকই মনে করেন দরিদ্র জনগনের অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে চাই সরকারী সাহায্য, নয়তো বিদেশী অনুদান। কিন্ত একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যেতো, এ দেশে যে বিপুল পরিমান অর্থ যাকাতের মাধ্যমে বিতরণ করা হয় তার সুষ্ঠু, সংগঠিত ও পরিকল্পিত ব্যবহার হলে এসব দরিদ্র লোকদের অবস্থার পরিবর্তন করা খুবই সম্ভব।

উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, বহু ধনী ব্যক্তি বিশ-পঁচিশ হাজার টাকার উপর যাকাত দিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা সাধারনত-এই অর্থের বড় অংশ নগদ পাঁচ/দশ টাকার নোটে পবিত্র রমযান মাসের শেষ দশ দিনে বাড়ির গেটে উপস্থিত গরীব নারী-পুরুষের মধ্যে বিলিয়ে দেন, বাকীটা শাড়ি-লুঙ্গী আকারে বিতরণ করে থাকেন। কখনও কখনও এরা এলাকার মাদ্রাসার লিল্লাহ বোডিং বা ইয়াতিমখানাতেও এই অর্থের কিছুটা দান করে থাকেন। এরা মুসাফির ঋণগ্রস্থ অসুস্থ লোকদের কথা আদৌ বিবেচনায় আনেন না। বিবেচনায় আনেন না আল্লাহর পথে মুজাহীদদের জন্যে খরচের কথাও। অথচ এরাই যদি পরিকল্পিতভাবে এলাকার দুস্থ, বিধবা, সহায়-সম্বলহীন পরিবারের মধ্যে থেকে বাছাই করে প্রতি বছর অন্ততঃ তিন/চারটি পরিবারকে নিজের পায়ে দাড়াবার জন্যে রিক্সা, ভ্যান, সেলাই মেশিন, ছাগল ইত্যাদি কিনে দিতেন তাহলে দেখা যেতো তার একার প্রচেষ্টাতেই পাঁচ বছরে তার এলাকায় অন্ততঃ বিশটি পরিবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে। ভিক্ষুক ও অভাবী পরিবারের সংখ্যাও কমে আসছে।
দৈনিক সূর্যউদয় / মাঈনউদ্দিন সাঈদ

Share.

Leave A Reply

Translate »