বগুড়ার পোড়াদহের মেলায় শত কেজির বাঘাইর মাছ - সূর্য উদয়


বগুড়ার পোড়াদহের মেলায় শত কেজির বাঘাইর মাছ

0

বগুড়ার আড়াইশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহি পোড়াদহ মেলায় আগত দর্শনার্থীরা সেই কারণ থেকেই ভিড় করছেন মেলায় নিয়ে আসা ১শ’ কেজির বাঘাইর মাছ দেখার এবং কেনার জন্য। গোলাবাড়ীর চক মরিয়ার মাছ ব্যবসায়ী লাল মিয়া জানান, যুমনা নদী থেকে এই মাছ টি কিনেছি  ১লাখ টাকায়। আশা করছেন মাছটি ১লাখ ২০ হাজার টাকায় বেচতে পারবেন। এছাড়াও ৯০ কেজি ও ৪০ কেজি ওজনের আরও কয়েকটি বাঘাইর মাছ  তুলেছিলেন মেলায়। বগুড়া গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নে গোলাবাড়িতে প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বুধবার এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এবার প্রথম মেলায় জমি দেয়া নিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানের সাথে জমির মালিকদের একটা সমস্যার কারণে মেলা পিছিয়ে ফাল্গুন মাসের ২ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। অনেক বছরের পুরোনো এ মেলাটা কবে কখন শুরু হয়েছিল তা ঐ এলাকার কেউই আর সঠিকভাবে বলতে পারে না। তবে মেলা নিয়ে এলাকার মানুষের মাঝে বেশ কিছু কিংবদন্তি আছে। এর মধ্যে একটা হলো পোড়াদহ মেলা সংলগ্ন বাঙালি নদীতে প্রতিবছর মাঘের শেষ বুধবারে অলৌকিকভাবে একটা বড় কাতল মাছ পিঠে সোনার চালুনি নিয়ে ভেসে উঠতো। আর মাঘের শেষ বুধবারে সেই ঘটনা দেখার জন্য ওই এলাকায় বিপুল লোকজনের সমাগম ঘটতো। এসব দেখে  সাধারণ মানুষ  বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় মাছ নিয়ে এসে কেনা-বেচা শুরু করেন। বড় বড় মাছ বিক্রির জন্য পোড়াদহ মেলাটি উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মেলার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ হলো নদীর বিভিন্ন প্রজাতির বাঘাইর, বোয়াল, রুই, কাতলা, পাঙ্গাস মাছ। তবে এখন মেলায় নদীর মাছের পাশাপাশি পুকুরের মাছের ব্যাপক আমদানি ঘটেছে। মেলা উপলক্ষে মাছ ব্যবসায়ীরা নদী থেকে ধরা বড় বড় মাছ হেপা করে বেঁধে রাখে। মড়িয়া গ্রামের মাছ বিক্রেতা ইসলাম ২০ কেজি ওজনের কাতলা মাছ নিয়ে এসেছিলেন। মাছটির দাম হয়েছে ২ হাজার টাকা কেজি দরে ৪০ হাজার টাকা। এছাড়াও মেলায় ১০ কেজি ওজনের বোয়াল মাছ, ১৫ কেজি ওজনের পাঙ্গাস মাছ,  ১০ কেজির রুই মাছ।মেলা উপলক্ষে মেলার আশেপাশের প্রতিটি বাড়ীর জামাই-মেয়ে ও অতিথিদের আপ্যায়নে বড় মাছ কেনার রীতিও বহু পুরনো। রীতি অনুযায়ী জামাইকে মেলা করার জন্য শ্বশুড়বাড়ীর লোকেরা টাকা দিয়ে থাকে। আর জামাইও সেই টাকা  রেখে শ্বশুরবাড়ীর জন্য তার সাধ্য অনুযায়ী বড় মাছটি কিনে বাড়ী ফিরেন। মাছ ছাড়াও পুরাদহ মেলায় প্রচুর আসবাবপত্র, বিভিন্ন সাইজের বড় মিষ্টি, পোশাক, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, লোহার জিনিসপত্র, মেয়েদের প্রসাধণী সামগ্রী, এছাড়া ব্যাপক পরিমানে চুন পাওয়া যায়।

এবারের মেলায় মাছের পর বিভিন্ন সাইজের বিশাল বিশাল মাছ মিষ্টির স্টলে মানুষের আগ্রহ বেশি। মহিষাবান সোনাকানিয়া থেকে আলমগীর প্রায় ১৯ প্রকারের মিষ্টি তুলে সবার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন। তার স্টলে রুই এবং কাতলা মাছের আদলে বানানো ১০ কেজি ওজনের মিষ্টির দামাদামি করছিলেন ভোজনবিলাসীরা। ১০ কেজি ওজনের প্রতিটি মিষ্টির দাম ৩ হাজার টাকা । তিনি ছাড়াও একই এলাকার মোঃ মোজাফ্ফর রহমানও ১০ কেজি ওজনের মিষ্টি তুলেছিলেন।মেলা উপলক্ষে ঢাকা থেকে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন মৌসুমি সুলতানা। ছেলে-মেয়ে ও অন্যান্য আত্মীদের সাথে ঘুরছিলেন, কিনছিলেন ঠুকিটাকি। বললেন,  এবার মেলা হবে কি হবেনা এই নিয়ে শংশয় থাকলেও শেষ পর্যন্ত এত বছরের পুরনো মেলাটি যে হলো এতেই আমরা অনেক খুশি। আমরা এলাকার মানুষরা যে যেখানে থাকিনা কেন এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকি।  প্রতিটি বাড়িতে অতিথি আসে। সবার সাথে বছরের এই দিনে দেখা হয়। এটা আমাদের জীবনের সাথে মিশে আছে।

ধুনট থানার অনেক ইউনিয়নের আসবাবপত্র কিনতে এসেছেন। মেলা থেকে আসবাবপত্র কিনলে একটু সাশ্রয় হয় বলে এলাবাসীর মতামত। । বগুড়ার গাবতলী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ খায়রুল বাসার বলেন মেলায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আগে থেকেই বিক্রেতারা ভিড় করায় মেলার আগে থেকেই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।মেলাকে কেন্দ্র করে একদিন আগে থেকেই বগুড়াসহ আশেপাশের উপজেলাগুলোতে সাড়া পরে যায়। আর মেলা এলাকার আশেপাশের সবগ্রামে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। মেলা উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত খাওয়ানো, বেড়ানো এবং কেনা-কাটা করা সামাজিক রীতিতে পরিনত হয়েছে। এবার মেলার জায়গা কম হলেও মেলায় আসা উচ্ছ্বসিত লোকসমাগম সেই আগের মতই ছিল।

 

Share.

Leave A Reply

Translate »